বিশ্লেষণ

সমকামী ও আদালতের রায়

গণেশ দেবনাথ, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮;

‘কোনটা সঠিক আর কোনটা সঠিক নয় সেটা কে ঠিক করে দেবে? এটা কি রাস্ট্র ঠিক করতে পারে আদৌ’ পছন্দসই যৌন প্রবনতার অধিকারকে অস্বীকার করা ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকে অস্বীকার করারই শামিল। গত ৬ই সেপ্টেম্বর ২০১৮ সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র সহ অপর চারজন বিচারপতি রোহিংটন নরিম্যান, এ এম খানউইলকর, ডি ওয়াই চন্দ্রচূড় ও ইন্দু মালহোত্রা’র ডিভিশন বেঞ্চ সর্ব সম্মতি ক্রমে এই রায় দেন। সমকামিতা আর অবৈধ নয়। এর ফলে ১৮৬১ সালে তৈরি IPC-377 ধারা অংশত বাতিল বলে গন্য হল। তবে এই ধারার অপর অংশ বিনা সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক ও শিশু ও পশুপ্রানীর সংগে যৌন সম্পর্ক পূর্বের মতোই অপরাধ বলে বহাল থাকছে।

উনবিংশ শতাব্দীতে স্থাপিত এই ধারা একবিংশ শতাব্দীতে পরিবর্তন তো হতেই হবে। ভারতীয় সংবিধানের এই ৩৭৭ বিশেষ ধারা সংশোধনের জন্য সুপ্রীম কোর্টের এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারনের আস্থার এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। কারণ কালে কালে পর্যালোচনায় ব্যক্তির মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ বিষয়টির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও এর সংগে জড়িয়ে ছিল।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির তার যৌনরুচি প্রাকৃতিক বিষয় সেখানে রাষ্ট্রকে বা কাউকে হস্তক্ষেপ করা ব্যক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের ক্ষমতাকে লংঘন করা ও অন্যদিকে ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারকেও অস্বীকার করে সরাসরি ব্যক্তির মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করার মতো বিষয় যা কখনোই কাম্য নয়।

অতএব সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যথেষ্ট সাহসী রায়। একে ঐতিহাসিক বলে অযথা বাড়াবাড়ি না করাই ভালো। জনৈক সাংবাদিক এর মতে প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষেরই এই রায়ে আদ্যন্ত কোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ নেই। এবং এই শতাংশ মানুষ প্রায় জানতই না এই ৩৭৭ ধারার কথা।
অতএব এই ৯৯ শতাংশ মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রামের চড়াই- উৎরাই এর পথে এই রায় কোন আশার আলো জ্বালাতে পারবে বলে মনে হয় না। অর্থনৈতিক ভারসাম্য, বেকারত্ব, জনস্বাস্থ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ , রিফুজি সমস্যা, সীমান্ত সমস্যা ও নানারকম জটিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানেও এই রায়ের কোন বিশেষ যোগদান আছে বলে মনে হয় না।
তবে মানবিক ভাবে এই রায় সমাজের সর্বস্তরের কাছেই গ্রহনীয়। প্রতিটি মানুষের জন্মচক্রে ভ্রুণ নির্বাচনে না জন্মদাতার না জন্মগ্রহণকারী কারোরই কোন হস্তক্ষেপ নেই। বিজ্ঞান যাই বলুক আমরা এটাকে ইশ্বরের দান বলে গ্রহন করি। আমাদের অতি প্রিয় যে -কেউ সেই ক্ষত নিয়ে জন্মালে এতে তার কি দোষ? তারও তো পৃথিবীতে বেঁচে থাকবার অধিকার রয়েছে। তারও তো কাউকে ভালোবাসার অধিকার আছে। তবে সেক্ষেত্রে যৌন স্বাধীনতা – যৌন স্বাধীনতা বলে প্রচার করে এক মহান সংগ্রামে জয়ী বলে উল্লাসে উচ্ছ্বাসে ফেটে – এই রায়ের ব্যাখ্যা করা তাতে সমাজের কাছে ভুল বার্তাই যাবে বলে মনে হয়। তাই এই জয়কে খানিকটা পারিবারিক বললেও ভুল হবে না, তবে ঐতিহাসিক নয়।
পরিশেষে বলে রাখি বিচারপতিদের ৩৭৭ ধারার বৃহৎ অংশ বাতিলের বিবৃতি প্রসঙ্গে উল্লেখ ছিল, “কোনটা সঠিক আর কোনটা সঠিক নয় সেটা কে ঠিক করে দেবে? এটা কি রাস্ট্র ঠিক করতে পারে আদৌ” সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত যুগোপযোগী। সময়ের সংগে মানুষকে ও সমাজকে এগিয়ে চলতেই হবে। নয়ত কীসের সভ্যতা! আর এই সভ্যতার পরিশীলিত রুচি-ই ঠিক করে দেবে কোনটা সঠিক আর কোনটা সঠিক নয় সেটা বোঝার।

Related posts

পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ফলাফলের ধাক্কায় উত্তরবঙ্গের বিজেপি কর্মীদের উৎসাহ তলানিতে

Topnewstoday

Leave a Comment