বর্ধমানের নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল বর্তমানে নিজের পায়ে দাড়িয়েছে

Zoom In Zoom Out Read Later Print

ইতিমধ্যেই একটু একটু করে বর্ধমানের এই নতুনগ্রামের কাঠের পুতুলের শিল্পকলা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত হয়েছে। বদলে যাচ্ছে প্রতিদিনই জীবনধারা।

নিজস্ব সংবাদদাতা, পূর্ব বর্ধমান, ২০ জানুয়ারি;

ছিল গ্রাম। ছিলেন শিল্পীরাও। ছিল আস্ত তথাকথিত খেটে খাওয়া গরীবগুর্বো মানুষদের নামাঙ্কিত একটি সরকারও। কিন্তু মুখ ফিরিয়েও তাকাননি তৎকালীন সরকার। ছিটেফোঁটাও কোনো সুরাহা চুঁইয়ে এসে ঢোকেনি পূর্ব বর্ধমানের অগ্রদ্বীপ ষ্টেশনের অদূরে থাকা কাঠের পুতুলের গ্রাম বলে পরিচিত নতুনগ্রামে।

সময় বদলেছে। বদলেছে চিন্তাভাবনা থেকে শিল্পীদের শিল্পকর্মও। বদলেছে সরকার। গত ৫ বছর আগের নতুনগ্রামে এসেছে আমূল বদল। বাংলা নাটক ডট কমের হাত ধরে রাজ্য সরকারের খাদি ও গ্রামোদ্যোগ দপ্তরের সহযোগিতায়। নয় নয় করেও নতুন গ্রামে রয়েছেন ৩০০ থেকে ৩৫০ জন শিল্পী। এই গ্রামের পরিবার মানেই এক একজন শিল্পী। তা সে প্রবীণ হোক কিংবা নবীন। মোটামুটি বছর দশেক বয়স হলেই শৈল্পিক রক্তের টানে হাতে তুলে নেয় বাটালি আর হাতুড়ি শিশুরাও। ইতিমধ্যেই একটু একটু করে বর্ধমানের এই নতুনগ্রামের কাঠের পুতুলের শিল্পকলা দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও সমাদৃত হয়েছে। বদলে যাচ্ছে প্রতিদিনই জীবনধারা।

একটা সময় নিজেদের হাতের তৈরী কাঠের পুতুল নিজেদেরই যেখানে খুঁজে পেতে মেলা খেলায় বিক্রি করতে হত। এখন আর সেটা করতে হচ্ছে না শিল্পীদের। বাংলা নাটক ডট কম সংস্থার উদ্যোগে নতুনগ্রামের ৬০টি পরিবারকে নিয়ে তৈরী করে দেওয়া হয়েছে একটি সমবায়। সেই সমবায়ের মাধ্যমে শিল্পীরা সরাসরি বাজারজাত করার সুযোগ পাচ্ছেন তাদের শিল্পকর্মকে।

সম্প্রতি প্যারিস শহরে ১৫দিনের একটি অনুষ্ঠান সেরে নতুনগ্রামে ফিরেছেন দিলীপ সুত্রধর। তিনিই এই সমবায়ের সম্পাদক। জানিয়েছেন, নতুনগ্রামের এই কাঠের পুতুলের ইতিহাস বেশ মজার। মূলত, নতুনগ্রামের কাঠের পেঁচা, রাজারাণী, কার্তিক গণেশের চাহিদাই তুঙ্গে। এক ইঞ্চির তিনভাগের এক ভাগের আয়তন থেকে চাহিদা অনুযায়ী বড় মাপের তৈরী করা হয় এই পুতুল। তিনি জানিয়েছেন, মূলত গ্রাম্য কাঠ দিয়েই তৈরী হয় এই পুতুল। গড়ে একএকটি পরিবার ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত কাঠের কাজ করেন প্রতিমাসে।

তিনি জানিয়েছেন, কিন্তু কাঠের পুতুলের জন্য আদর্শ গামার কাঠের দাম বেশি হওয়ায় কিছুটা সমস্যার মধ্যে পড়েছেন তাঁরা। গামার কাঠের তৈরী পুতুলের দাম অন্যান্য কাঠের তুলনায় অনেকটাই বেশি হওয়ায় ক্রেতার সংখ্যা কম।

দিলীপবাবু জানিয়েছেন, নয়নয় করেও প্রায় ৩০০বছরের পুরনো নতুনগ্রামের এই কাঠের পুতুলের ইতিহাস। শোনা যায়, একসময় এই গ্রামের নাম ছিল জানকীনগর। অগ্রদ্বীপের গঙ্গার ধারের এই জায়গা ছিল বনাকীর্ণ। সেই সময় এক সাধক বনের মধ্যে তপস্যা করতেন। তিনিই সেই সময় গ্রামবাসীদের জানিয়েছিলেন, লক্ষ্মীর বাহন হিসাবে পেঁচার পুজো করতে, তাতেই গ্রামবাসীদের মঙ্গল হবে। আবার কেউ কেউ বলেন, একটা সময় এই জায়গা ছিল অত্যন্ত নিরিবিলি, শান্ত। সেই সময় বড় বড় গাছে প্রচুর পেঁচা থাকত। তা থেকেই সংস্কারবশত, এখানকার ছুতোর তথা সূত্রধর পরিবারগুলি পেঁচা তৈরীর কাজ শুরু করেন।

বাংলা নাটক ডট কমের প্রকল্পাধিকারিক নির্মাল্য রায়, সদস্য ঝণ্টু দাস, মলয় দাস প্রমুখেরা জানিয়েছেন, ২০১৩ সালে তাঁরা খাদি দপ্তরের সহযোগিতায় এই গ্রামে কাজ শুরু করেন। ইতিমধ্যেই গ্রামের এই পুতুল শিল্পীদের কাঠ চেড়াইয়ের বড় সমস্যা থাকায় স্থানীয় কাঠিয়াবাবা আশ্রমের পক্ষ থেকে ১ বিঘে দানের জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে ওয়ার্কশপ। সেখানে কাঠ চেরাইয়ের মেশিন সহ আনুষঙ্গিক সমস্তরকমের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। রয়েছে অতিথিনিবাসও।

এছাড়াও সরাসরি শিল্পীদের সঙ্গে ক্রেতাদের যোগসূত্র তৈরী করতে প্রতিবছর তিনদিন ধরে এই গ্রামে মেলা বসানো হয়। এবারেও ১৮ থেকে ২০ জানুয়ারী এই মেলা বসানো হয়েছে। গতবছর এই মেলা থেকেই প্রায় দেড় লক্ষ টাকার পুতুল বিক্রি হয়েছিল। এবারে তা আরও বাড়ার সম্ভাবনা। ইতিমধ্যেই দেশ বিদেশের বহু পর্যটক আসতে শুরু করেছেন। ফলে উপকৃত হচ্ছেন শিল্পীরা। শিল্পী নিমাই ভাস্কর, শিবশংকর সূত্রধররা জানিয়েছেন, এখানে মূলতই পুরুষ শিল্পীরা কাঠ কাটা এবং নকশা তৈরীর কাজ করেন। মহিলারা করেন রং-এর কাজ। গড়ে প্রতিদিন এক একটি পরিবার ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন এখন। তবে কেবলমাত্র নতুনগ্রাম এখন আর পেঁচা কিংবা রাজারাণীর পুতুল তৈরীতেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা তৈরী করছেন আসবাবপত্রও। এমনকি এই নকসাকেই অবলম্বন করে ঘর সাজানোর খাট, টেবিল থেকে বিবিধ আসবাব তৈরী করছেন। যা রীতিমত আলোড়ন ফেলে দিয়েছে বাজারে। বর্তমানে শিল্পীদের ডাকও পড়ছে গৃহসজ্জায়।

কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে প্রবীণ শিল্পীদের নিয়ে। বয়সের ভারে, চোখের দৃষ্টি কমে আসতে থাকায় তাঁরা আর কাজ করতে পারছেন না। কিন্তু তাদের জন্য সরকারী কোনো সুযোগ সুবিধা আজও জোটেনি। দিলীপ সূত্রধর জানিয়েছেন, সরকারের কাছে তাঁদের আবেদন, এই প্রবীণ ও অসহায় শিল্পীদের জন্য মাসিক ভাতা চালু করুক সরকার তাহলেই অনেকটা সুরাহা হবে শিল্পীদের।

See More

Latest Photos